যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকদের জন্য ব্যস্ততম সময় হলো বছরের তৃতীয় প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর)। আর আমদানির বড় একটি উৎস চীন। এ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নতুন সেশন ও ছুটির মৌসুমের চাহিদা সামাল দিতে পণ্য মজুদ করেন খুচরা বিক্রেতারা। তবে এবারের চিত্র একদম ভিন্ন। ব্যস্ততম সময় কাটানোর বদলে চীন-মার্কিন শিপিং কার্যক্রম ধীর হয়ে পড়ছে, যার প্রভাব পড়েছে ওই রুটের জাহাজ ভাড়ায়। এ পরিস্থিতি চলতি ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষের দ্বিতীয়ার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) পুরো সময়জুড়ে অব্যাহত থাকতে পারে। ট্রান্সপ্যাসিফিক রুটে জাহাজ ভাড়া কমে বর্তমানে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলগামী জাহাজের গড় স্পট রেট গত ৫ জুনের পর থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ঘিরে আগে থেকেই সতর্ক ছিলেন মার্কিন ব্যবসায়ীরা। এ কারণে গত বছরের শেষ প্রান্তিক থেকে বাড়তি শুল্ক এড়াতে দীর্ঘদিন গুদামজাত করা যায় এমন চীনা পণ্যের চাহিদা বাড়ছিল। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে শুল্ক বৃদ্ধির স্থগিতাদেশ নিয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হয়। এর পর থেকে খুচরা বিক্রেতারা দ্রুত চীনা পণ্য কিনতে শুরু করেন।
এখন সেই ক্রয়াদেশের সরবরাহ ধীরে ধীরে কমে আসছে। চলতি মাসে এ হার আরো কমবে, যার প্রভাব পড়েছে জাহাজ ভাড়ায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, শিগগিরই ৪০ ফুট সমতুল্য ইউনিট বা এফইইউ কনটেইনারপ্রতি ভাড়া ২ হাজার ডলারের কাছাকাছি নেমে আসবে। অথচ দুই মাস আগে ভাড়া ছিল ৫ হাজার ৫০০ ডলারের বেশি।
শিপিং চাহিদার প্রতিক্রিয়া শুধু ভাড়া কমানোয় সীমিত নয়। লজিস্টিকস কোম্পানি ডাইমারকোর তথ্য অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরীয় রুটে পরিষেবা কমিয়ে আনতে শুরু করেছে কিছু শিপিং কোম্পানি। এর বদলে তারা এশিয়ার অভ্যন্তরীণ রুটে জাহাজ চলাচল পুনর্বিন্যাস করছে। কিছু কোম্পানি এশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র রুটে নির্দিষ্ট বন্দর এড়িয়ে চলছে বা যাত্রা পুরোপুরি বাতিল বাড়িয়েছে।
শুল্ক বিবাদে ওয়াশিংটনকে বরাবরই পাল্টা জবাব দিয়ে গেছে বেইজিং। এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থায় মার্কিন শুল্কহার সর্বোচ্চ ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এরপর উভয় দেশ সমঝোতায় পৌঁছে তা ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনে। তারা এখন সেই সমঝোতার মেয়াদ ১২ আগস্টের পর বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের ওপরই নির্ভর করছে। মূলত চলমান সমঝোতার কারণে পরবর্তী স্কুল সেশনের জন্য ব্যাকপ্যাক, কলম ও খাতা এবং ব্ল্যাক ফ্রাইডে ও ছুটি মৌসুমের কেনাকাটার জন্য খেলনা ও অন্যান্য পণ্যের ক্রয়াদেশ দেয়ার সুযোগ পেয়েছেন মার্কিন আমদানিকারকরা।
নরওয়েভিত্তিক শিপিং ও লজিস্টিকস বাজার বিশ্লেষক জেনেটার শিপিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক এমিলি স্টাউসবোয়েলের মতে, ‘তৃতীয় প্রান্তিক হলো মার্কিন আমদানি চাহিদার শীর্ষ সময়। কিন্তু আগাম রফতানির কারণে এবার সেই চাহিদার পণ্য আগেই চলে এসেছে। তাই বছরের বাকি সময় শিপিং চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার সম্ভাবনা খুব কম।’
লার্নিং রিসোর্সেস নামের শিক্ষামূলক খেলনা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সিইও রিক ওলডেনবার্গ জানান, জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে চীনসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে তার প্রতিষ্ঠানের পণ্য আমদানি গত বছরের তুলনায় কম হবে। কারণ মে মাসে চীনা শুল্ক বৃদ্ধির ওপর ৯০ দিনের বিরতি ঘোষণার পরই তারা অগ্রিম ক্রয়াদেশ দিয়েছিলেন।
তিনি আরো জানান, ভোক্তা চাহিদা ও বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তার কারণে পণ্য উৎপাদনে বৈচিত্র্যও কমেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন ক্রেতারা এখন আগের তুলনায় আরো সতর্ক হয়ে উঠেছেন। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জুনে খুচরা বিক্রি কমেছে। চলতি বছরে ফেব্রুয়ারির পর এই প্রথম এমন প্রবণতা দেখা গেল। এর মধ্য দিয়ে ভোক্তাদের ব্যয় কমিয়ে আনার প্রবণতা প্রকাশ পাচ্ছে।
রিক ওলডেনবার্গ জানান, ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের পর তার কোম্পানি চীন থেকে ভিয়েতনাম ও ভারতে উৎপাদন কার্যক্রম সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ট্রাম্পের সর্বশেষ ঘোষিত শুল্কতালিকা খানিকটা বিপত্তি তৈরি করেছে। কারণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় ঘোষিত শুল্কহার চীনের বাইরে উৎপাদন কেন্দ্র স্থানান্তরের চেষ্টায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
জুলাইতেই সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রে বছরের সর্বোচ্চ পণ্য আমদানি হয়ে গেছে বলে সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন লস অ্যাঞ্জেলেস বন্দরের নির্বাহী পরিচালক জিন সেরোকা।
বিভিন্ন পূর্বাভাসেও উঠে এসেছে, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক কার্যক্রম এখন ধীর হয়ে আসছে। ফিচ রেটিংস গত জুনে বৈশ্বিক শিপিং খাতের ২০২৫ সালের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ অবস্থান থেকে পরিবর্তন করে ‘অবনতিশীল’ করেছে। এর কারণ হিসেবে দুর্বল ভোক্তা চাহিদা ও লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের আক্রমণ পুনরায় বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
সাপ্লাই চেইন ইনোভেশন নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা উলফগ্যাং লেহমাখার বলেন, ‘বৈশ্বিক শিপিং খাত চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে কঠিন সময়ের মধ্যে পড়বে। সম্ভবত ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকও (জানুয়ারি-মার্চ) মন্থর যাবে।’
বাকি সময়ের মধ্যে শিপিং খাতে চাহিদা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নেই। এ বিষয়ে অন্যদের সঙ্গে একমত ফ্রেইট রাইটের সিইও রবার্ট খাচাত্রিয়ান। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছি, যেখানে পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কারণ এ মৌসুমে এখন আর ঘুরে দাঁড়ানোর মতো সময় নেই। ব্ল্যাক ফ্রাইডের আগ পর্যন্ত যে সময় রয়েছে, তা খুচরা বিক্রেতাদের জন্য ক্রয়াদেশ বাড়ানোর মতো যথেষ্ট নয়।’
চীনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল থেকে দেশটির কারখানাগুলোয় নতুন ক্রয়াদেশ কমছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এশিয়া আঞ্চলিক পরিচালক অ্যালেক্স হোমস বলেন, ‘অগ্রিম রফতানি কমে যাওয়ার ফলে চীনসহ পুরো অঞ্চলের বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি আরো চাপে পড়বে।’